নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | 59 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু না করেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, বিদ্যমান উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে যোগ্য কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে। তবে এ প্রক্রিয়ায় শেয়ার বিক্রি, মূল্য নির্ধারণ এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জে সিকিউরিটিজের সরাসরি তালিকাভুক্তি) বিধিমালা, ২০২৬’ নামে নতুন বিধিমালাটি গেজেট আকারে জারি করেছে বিএসইসি। ১৮ অক্টোবর গেজেট জারি করা হলেও তা প্রকাশ করা হয়েছে সোমবার (১৯ অক্টোবর)। বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকাশের পর থেকেই এটি কার্যকর হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানির বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ পরিশোধিত শেয়ার বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথম দিনের লেনদেনে শেয়ারের বাজারদর নির্ধারণের জন্য প্রথম দুই ঘণ্টা মূল্য অনুসন্ধানের সময় রাখা হবে। এ সময়ে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার প্রস্তাব দিতে পারবেন, তবে বিক্রেতারা কোনো বিক্রয়াদেশ দিতে পারবেন না। মূল্য অনুসন্ধান শেষে বাজারে প্রচলিত সর্বোত্তম দামে শেয়ার বিক্রির কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বিধিমালায় শেয়ারের সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। রেফারেন্স প্রাইস বা নির্দেশক মূল্যের তুলনায় এই মূল্য অন্তত ২৫ শতাংশ কম হতে হবে। তবে সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত মূল্যকে শেয়ারের চূড়ান্ত বাজারদর হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। প্রথম দিনের মূল্য অনুসন্ধান ও লেনদেনের মধ্য দিয়েই শেয়ারের বাজারদর নির্ধারিত হবে।
এ ছাড়া সরাসরি তালিকাভুক্তির আওতায় বিক্রির জন্য নির্ধারিত মোট শেয়ারের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ একজন ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কিনতে পারবেন। প্রথম দুই লেনদেন দিবসে একক আদেশে ১০০টির কম কিংবা ১ হাজারের বেশি শেয়ার কেনার আদেশ গ্রহণ করা হবে না। শেয়ার বিক্রি ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এসব সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে যেসব প্রতিষ্ঠান
নতুন বিধিমালায় কয়েকটি শ্রেণির প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ সরকারের মালিকানায় থাকলেও সেটি যোগ্য প্রতিষ্ঠানের আওতায় আসতে পারে। একইভাবে সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিও এই সুযোগের জন্য বিবেচিত হবে।
সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা নিট সম্পদ রয়েছে—এমন তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। পাশাপাশি যেসব কোম্পানির বার্ষিক ব্যবসায়িক লেনদেন বা টার্নওভার অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা, তারাও এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
বিএসইসিতে নিবন্ধিত স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি এবং ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানিকেও যোগ্য প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কমিশন প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য কোনো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য যোগ্য ঘোষণা করতে পারবে।
তবে নির্ধারিত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হওয়াই তালিকাভুক্তির নিশ্চয়তা নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিধিমালায় উল্লেখ করা আর্থিক সক্ষমতা, পরিচালনাগত যোগ্যতা এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করতে হবে।
পাঁচ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও দুই বছরের মুনাফা বাধ্যতামূলক
সরাসরি তালিকাভুক্তির আবেদনকারী কোম্পানিকে অবশ্যই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হতে হবে। আবেদন করার আগে টানা অন্তত পাঁচ বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানির ব্যবসা অব্যাহত রাখার সক্ষমতা নিয়ে কোনো হুমকি থাকা চলবে না।
বিধিমালা অনুযায়ী, আগের দুই অর্থবছরে কোম্পানিকে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন করতে হবে। কোনো পুঞ্জীভূত লোকসান থাকা যাবে না এবং সর্বশেষ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ ইতিবাচক হতে হবে। তবে সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের ভিত্তিতে কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এসব শর্ত শিথিল করার ক্ষমতা বিএসইসির রয়েছে।
কোম্পানিকে প্রযোজ্য আইন অনুসারে নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন করতে হবে। এ ছাড়া আগের দুই বছরে বোনাস বা রাইট শেয়ার ছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে নগদ অর্থের বিনিময়ে নতুন মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে। বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডার, বিদেশি শেয়ারহোল্ডার কিংবা কৌশলগত বিনিয়োগকারীর বাইরে অন্য কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের মূলধন সংগ্রহ করা যাবে না।
ঋণখেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কোম্পানি, এর কোনো উদ্যোক্তা কিংবা পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ঋণতথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারবেন না।
এ ছাড়া বিএসইসিতে নিবন্ধিত কোনো ক্রেডিট রেটিং কোম্পানির কাছ থেকে ঋণমান নির্ধারণ করাতে হবে। সেই ঋণমান বিনিয়োগযোগ্য পর্যায়ের নিচে থাকা চলবে না। জনসাধারণের উদ্দেশে কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ইস্যু করা ঋণ সিকিউরিটিজের দায় পরিশোধে খেলাপি কোম্পানিও সরাসরি তালিকাভুক্তির যোগ্য হবে না।
কোম্পানির আর্থিক বিবরণী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুসারে প্রস্তুত করতে হবে এবং বাংলাদেশে গৃহীত আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মান (আইএসএ) অনুযায়ী নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। তবে বিএসইসির নির্ধারিত নিরীক্ষক প্যানেল থেকে নিরীক্ষক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য শিথিল করা হয়েছে।
একই সঙ্গে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বড় ধরনের জালিয়াতি কিংবা শেয়ারবাজারে অসদাচরণে জড়িত না থাকার ঘোষণা দিতে হবে। তালিকাভুক্তির পর এক বছরের মধ্যে বিএসইসির করপোরেট গভর্ন্যান্স-সংক্রান্ত শর্ত পূরণের অঙ্গীকারও জমা দিতে হবে।
উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে থাকতে হবে অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার
সরাসরি তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির মালিকানা কাঠামো ধরে রাখতে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার ধারণের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে বিএসইসি। তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শেয়ার সম্মিলিতভাবে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে থাকতে হবে। পরবর্তী সময়েও এই ন্যূনতম মালিকানা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
এই পদ্ধতিতে কোম্পানির নতুন শেয়ার ইস্যু করে মূলধন সংগ্রহ করা হবে না। বরং উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডারদের বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ফলে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ কোম্পানির তহবিলে জমা হবে না; তা পাবেন সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা।
এ কারণে বিনিয়োগকারীদের অবহিত করতে তথ্যপত্রে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। অর্থাৎ, শেয়ার বিক্রির অর্থ সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, পরিচালক বা প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডারের কাছে যাবে এবং কোম্পানি এ অর্থের কোনো অংশ পাবে না। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের এ তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে লাগবে দুটি পদ্ধতির মূল্যায়ন
সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কোম্পানি মার্চেন্ট ব্যাংকারের সঙ্গে আলোচনা করে রেফারেন্স প্রাইস নির্ধারণ করবে এবং তথ্যপত্রে তা প্রকাশ করবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, মূল্যায়নের জন্য অন্তত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। এর মধ্যে একটি হতে হবে নিরঙ্কুশ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অন্যটি তুলনামূলক মূল্যায়ন পদ্ধতি।
নিরঙ্কুশ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহের বর্তমান মূল্য নির্ধারণ, সম্পদভিত্তিক মূল্যায়ন এবং রেসিডুয়াল ইনকাম মডেল ব্যবহার করা যাবে। অন্যদিকে তুলনামূলক মূল্যায়নে শেয়ারপ্রতি আয়ের বিপরীতে মূল্য, শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদের বিপরীতে মূল্য, পরিচালন নগদ প্রবাহের বিপরীতে মূল্য এবং প্রতিষ্ঠানের মূল্য ও সুদ, কর, অবচয় ও পরিশোধের আগের মুনাফার অনুপাতের মতো পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবে।
মূল্যায়নের জন্য কোনো পদ্ধতি বেছে নেওয়ার কারণও তথ্যপত্রে ব্যাখ্যা করতে হবে। পাশাপাশি মূল্যায়নে ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্ত, অনুমান, প্রবৃদ্ধির হার, ডিসকাউন্ট রেট এবং তুলনীয় কোম্পানি নির্বাচনের ভিত্তি প্রকাশ করতে হবে। মার্চেন্ট ব্যাংকারকে পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার যথার্থতা যাচাই করে এ বিষয়ে সনদ দিতে হবে।
আবেদন ফি এক লাখ টাকা, মার্চেন্ট ব্যাংকার নিয়োগ বাধ্যতামূলক
সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানিকে সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে খসড়া তথ্যপত্র, মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং বিধিমালায় চাওয়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। এ আবেদনের জন্য নির্ধারিত ফি এক লাখ টাকা।
প্রতিটি আবেদনকারী কোম্পানিকে বিএসইসিতে নিবন্ধিত মার্চেন্ট ব্যাংকার নিয়োগ করতে হবে। তথ্যপত্র প্রস্তুত, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ, যথাযথ যাচাই সনদ প্রদান এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির তথ্য উপস্থাপনের দায়িত্ব পালন করবে মার্চেন্ট ব্যাংকার।
প্রয়োজনে কোম্পানি অতিরিক্ত মার্চেন্ট ব্যাংকার, বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাংকার, আর্থিক উপদেষ্টা কিংবা অন্য কোনো বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে পারবে। তবে অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ নিয়োগের কারণে মূল মার্চেন্ট ব্যাংকারের দায়িত্ব ও জবাবদিহি কমবে না।
এ ছাড়া মার্চেন্ট ব্যাংকার, নিরীক্ষক, মূল্যায়নকারী, ক্রেডিট রেটিং কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিজ নিজ প্রতিবেদন এবং তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করতে হবে। ভুল তথ্য প্রদান, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী তাদের দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
আবেদন যাচাই ও অনুমোদনে নির্দিষ্ট সময়সীমা
সরাসরি তালিকাভুক্তির আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নথিপত্রে কোনো ঘাটতি থাকলে তা সংশোধনের জন্য কোম্পানিকে জানাবে। ওই চিঠি পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় তথ্য বা নথি জমা দিতে হবে কিংবা উত্থাপিত ঘাটতির বিষয়ে জবাব দিতে হবে।
এরপর স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানির দাখিল করা নথি, তথ্যপত্র এবং শেয়ার মূল্যায়নের পদ্ধতি যাচাই করবে। প্রয়োজন হলে কোম্পানির কারখানা, কার্যালয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে পারবে। একই সঙ্গে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে আইনগত, আর্থিক, কারিগরি, পরিবেশগত কিংবা অন্য বিশেষায়িত বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ থাকবে।
কোম্পানির মুনাফা, তারল্য পরিস্থিতি, ঋণের অবস্থা, নগদ প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট শিল্পে অবস্থান এবং বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতাও মূল্যায়নের আওতায় আসবে।
সব শর্ত পূরণ হলে স্টক এক্সচেঞ্জ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তালিকাভুক্তির অনুমোদন এবং শেয়ার বিক্রির তথ্যপত্র অনুমোদন করতে পারবে। শর্ত পূরণ না হলে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যাবে। তবে প্রত্যাখ্যানের আগে কোম্পানিকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের যুক্তিসংগত সুযোগ দিতে হবে। আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত আবেদনের তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে জানাতে হবে এবং এর কারণ উল্লেখ করতে হবে।
আবেদন বাতিল বা প্রত্যাখ্যাত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি আদেশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিএসইসির কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবে। কমিশন আবেদন পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে শুনানি নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারবে। এ বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
প্রথম লেনদেনের ১০ দিন আগে তথ্যপত্র প্রকাশ
স্টক এক্সচেঞ্জের অনুমোদন পাওয়ার পর তিন কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানিকে অনুমোদিত তথ্যপত্র প্রকাশ করতে হবে। কোম্পানির নিজস্ব ওয়েবসাইট, নিয়োগ করা মার্চেন্ট ব্যাংকার, সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জ এবং বিএসইসির ওয়েবসাইটে তা প্রকাশ বাধ্যতামূলক।
পাশাপাশি অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। এর একটি বাংলা এবং অন্যটি ইংরেজি দৈনিক হতে হবে। বিজ্ঞপ্তিতে কিউআর কোড ও ওয়েব লিংক যুক্ত করতে হবে, যাতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা সহজেই বিস্তারিত তথ্যপত্র দেখতে পারেন। প্রথম লেনদেনের অন্তত ১০ দিন আগে তথ্যপত্র প্রকাশ করতে হবে।
তথ্যপত্রে কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম, আর্থিক অবস্থা, সম্পদ ও দায়, মুনাফা-লোকসান, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, শেয়ার মালিকানার কাঠামো এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। প্রকাশিত তথ্যের উৎস ও ভিত্তিও উল্লেখ করতে হবে। কোনো অসমর্থিত বা বিভ্রান্তিকর দাবি করা যাবে না। প্রয়োজনে স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিকে অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশের নির্দেশ দিতে পারবে।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়ার অর্থ এই নয় যে স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা কিংবা তথ্যপত্রে দেওয়া প্রতিটি বক্তব্যের নিশ্চয়তা দিচ্ছে। তথ্যের যথার্থতা, নির্ভুলতা ও পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কোম্পানি, পরিচালক, প্রধান নির্বাহী, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা, মার্চেন্ট ব্যাংকার ও নিরীক্ষকের ওপর বর্তাবে।
৩০ লেনদেন দিবসের মধ্যে বিক্রি করতে হবে অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার
তালিকাভুক্তির প্রথম দিনে শেয়ারের লেনদেন শুরুর আগে মূল্য অনুসন্ধানের সময় নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জ। প্রথম লেনদেনের অন্তত তিন দিন আগে শেয়ারের সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত মূল্য প্রকাশ করতে হবে। এ মূল্য রেফারেন্স প্রাইসের চেয়ে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ নিচে নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক।
প্রথম দুই ঘণ্টায় বিনিয়োগকারীরা নির্ধারিত সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত মূল্যের নিচে শেয়ার কেনার প্রস্তাব দিতে পারবেন না। একই সময়ে বিক্রেতাদের কোনো বিক্রয়াদেশ দেওয়ার অনুমতি থাকবে না। মূল্য অনুসন্ধান পর্ব শেষ হলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিক্রয়াদেশ দেওয়া যাবে। প্রথম লেনদেনের দিন সংশ্লিষ্ট শেয়ারের ক্ষেত্রে সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হবে না।
বিধিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্তির প্রথম দিন থেকে ৩০ লেনদেন দিবসের মধ্যে উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডারদের সম্মিলিতভাবে কোম্পানির পরিশোধিত শেয়ারের কমপক্ষে ১০ শতাংশ বিক্রি করতে হবে।
তবে বিক্রির জন্য নির্ধারিত মোট শেয়ারের ১ শতাংশের বেশি কোনো একক ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কিনতে পারবেন না। এ সীমা পুরো বিক্রয়কালজুড়ে কার্যকর থাকবে।
প্রথম দুই লেনদেন দিবসে একক ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ১০০টি এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার শেয়ার কেনার বিধান রাখা হয়েছে। শেয়ার বিক্রির দায়িত্বে থাকা বিক্রেতাদের মনোনীত ব্রোকারদের প্রতিদিনের বিক্রিত শেয়ার, মোট বিক্রির পরিমাণ এবং অবিক্রীত শেয়ারের হিসাব স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে হবে। নির্ধারিত বিক্রয় কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর তিন কার্যদিবসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদনও জমা দিতে হবে।
এক বছর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারবেন না বিক্রেতারা
সরাসরি তালিকাভুক্তির পর সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, পরিচালক এবং অন্যান্য শেয়ার বিক্রেতা এক বছর পর্যন্ত ওই কোম্পানির কোনো শেয়ার কিনতে পারবেন না। পাশাপাশি তালিকাভুক্তির সময় তাদের হাতে থাকা শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রি করার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
তালিকাভুক্তির পর একটি পূর্ণ অর্থবছর শেষ হতে হবে এবং ওই অর্থবছরের পর কোম্পানির প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হতে হবে। এর আগে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও পরিচালকেরা তাদের হাতে থাকা শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রি করতে পারবেন না।
অর্থাৎ, সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম শেয়ার বিক্রির বাধ্যবাধকতা পূরণ করার পাশাপাশি উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের অবশিষ্ট শেয়ার বিক্রিতেও নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তালিকাভুক্তির পরপরই বিদ্যমান মালিকেরা যেন বড় অংশের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যেতে না পারেন, সে লক্ষ্যেই এ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
২০১৫ সালের বিধিমালার সরাসরি তালিকাভুক্তি-সংক্রান্ত ধারা বাতিল
নতুন বিধিমালা জারির মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ২০১৫ সালের তালিকাভুক্তি বিধিমালায় সরাসরি তালিকাভুক্তি-সংক্রান্ত ৮ থেকে ১৩ নম্বর বিধান বাতিল করা হয়েছে।
তবে আগের বিধানের অধীনে নেওয়া যেসব পদক্ষেপ, অনুমোদন কিংবা কার্যক্রম নতুন বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, সেগুলো বহাল থাকবে। আগে থেকে শুরু হওয়া মামলা ও আইনি কার্যক্রমও নির্ধারিত নিয়মে চলবে।
নতুন বিধিমালার আওতায় সরাসরি তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির পরও বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের প্রযোজ্য বিধিবিধান, নির্দেশনা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স-সংক্রান্ত শর্ত মেনে চলতে হবে। ফলে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি হলেও কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা, তথ্য প্রকাশ, মালিকানা কাঠামো ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একাধিক বাধ্যবাধকতা কার্যকর থাকবে।
Posted ৭:০২ পিএম | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
sharebazar24 | sajed khan
.
.